হৃদয়বিদারকঃ এক সন্তান কোলে আরেক সন্তান জলে!

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর থেকে বিজয়নগর উপজেলায় যোগাযোগের জন্য তৈরি হচ্ছে শেখ হাসিনা সড়ক। প্রায় ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়কে দুই পাশের বেশির ভাগ অংশজুড়েই থইথই পানি। বিলের ওই পানি আর চোখের পানি যেন একাকার হয়ে যায় শুক্রবার রাতে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর গ্রামের আঁখি বেগমের চোখে পৃথিবী যেন পুরোই অন্ধকার হয়ে গেছে। আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, স্বামী-সন্তানদের নিয়ে বিজয়নগরের চম্পকনগর গ্রাম থেকে নৌকায় করে ফিরছিলেন।

নৌকাটি ডুবে যাওয়ার সময় তাঁর বাঁ হাতে এক বছর বয়সী মেয়ে মোবাশ্বিরা এবং ডান হাতে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী ছেলে তানবীর হোসাইন ধরা ছিল। এক পর্যায়ে বড় ছেলে তার হাত থেকে ছিটকে যায়। এরপর থেকে তাকে পাচ্ছেন না। তাঁর স্বামী মুরাদ মিয়া হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, একটি লাশ উঠানো মাত্রই ছুটে আসছে স্বজনরা, সেটি নিজের কারো কি-না সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। অন্ধকারের মধ্যেই স্থানীয় লোকজনকে উদ্ধারকাজ চালাতে দেখা যায়। রাত সোয়া ৮টার দিকে ১৩ জনের লাশ নিয়ে একটি নৌকা জেলা সদরে আসে।

লাশগুলো সদর হাসপাতালে রাখা হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল গিয়ে জেনারেটর দিয়ে সেখানে আলোর ব্যবস্থা করে। এরপর উদ্ধার তৎপরতা জোরদার হয়। তখন আরো ছয়টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে মোমেনা, অঞ্জনা, মঞ্জু, রওশন আরা, ফরিদা ও মিনারা নামে ছয়জনের পরিচয় জানা গেছে।

বিলের পারে বসে কাঁদতে থাকা বিজয়নগরের জহিরুল ইসলাম জানান, সাত দিন আগে তিনি বিয়ে করেছেন। স্ত্রী শারমিনকে নিয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শ্বশুরবাড়িতে আসছিলেন।

নৌকাডুবিতে তিনি বেঁচে গেলেও স্ত্রীকে খুঁজে পাচ্ছেন না। জহিরুলের বড় ভাই শফিকুল ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমি তরে (জহিরুল) কইছলাম নতুন বউরে লইয়া নৌকা দিয়া আইছ না। তরে কইছলাম সিএনজি দিয়া আ। অহন কি বিফদ আইল। শারমিনরে তো খুঁইজ্জা পাইতাছি না।’

নিখোঁজ তাফসিয়া মীম নামের এক শিশুর মায়ের কান্না শুনে অনেকেই ভিড় জমান। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমার মাইয়া কই। আমার মাইয়ারে পাইতাছি না কেরে। আফনেরা আমার মাইয়ারে আইন্না দেন না।’

নিখোঁজ ভাইয়ের জন্য আহাজারি করছিলেন এনামুল ইসলাম মুন্না। মনিপুর ঘাট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আনন্দবাজার আসার জন্য তাঁর ভাই সিরাজুল ইসলাম নৌকায় ওঠেন বলে জানান তিনি। কয়েক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেও ভাইকে পাচ্ছেন না বলে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ফারুক মিয়া জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসার পথে বালুবাহী নৌকার ধাক্কায় তাঁদের ট্রলার ডুবে যায়। তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছেন না। কে বা কারা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে এনে ভর্তি করে।

ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের মনিপুর গ্রামের মো. কবির মিয়া নামের এক ব্যক্তি জানান, খবর পেয়ে তিনিসহ কয়েকজন মিলে এসে উদ্ধারকাজে অংশ নেন। তিনিসহ অন্যরা মিলে অন্তত ১৮টি লাশ উদ্ধার করেন। এ ছাড়া অর্ধমৃত অবস্থায় ১৫ থেকে ২০ জনকে স্বজনসহ অন্যরা নিয়ে যায়। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *