বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রাদুর্ভাব

ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ও মরুকরণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের নিত্যদিনের সঙ্গী।

হালে যোগ হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত বজ্রপাত। যদিও বজ্রপাত দেশে সব সময়ই ঘটেছে, তবে সম্প্রতি সেই সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। আগে আমরা বজ্রপাত ঘটতে দেখেছি মৌসুমভিত্তিক।

বিশেষ করে বর্ষা ও কালবৈশাখী মৌসুমে একটু বেশি লক্ষ করেছি। সম্প্রতি বজ্রপাতের হার সেই তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বছরের যে কোনো সময় সামান্য মেঘ জমলেই কিংবা ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা দিলেই বজ্রপাত হচ্ছে। সে এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে ঐ মুহূর্তে। এতে বিপুল প্রাণনাশের সংবাদও পাওয়া যাচ্ছে।

কেনো বজ্রপাতে এতো মৃত্যু?

এক সমীক্ষায় জানা যায়, এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটছে বাংলাদেশে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ বছরের এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া যায়।

গবেষক দলের প্রধান নাসার বিজ্ঞানী স্টিভ গডম্যানের গবেষণায় জানা যায়, এশিয়ার বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার মধ্যে বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার অবস্থান পঞ্চম। অন্যদিকে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের মধ্যে বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জে বেশি বজ্রপাত ঘটছে।

নাসার আরেক গবেষণায় জানা যায়, মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে প্রচুর বজ্রপাত ঘটে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কঙ্গোর কিনমারা ডেমকেপ এবং ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো লেক এলাকায় জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রচুর বজ্রপাত ঘটে। বিজ্ঞানীরা আরো বলেছেন, বজ্রমেঘ, বজ্রঝড় ও বজ্রপাত কোনো একক প্রতিফলন নয়। এসব হচ্ছে আবহাওয়ার অনেকগুলো উপাদানের ফল।

আরও পড়ুন:
শেষের সত্যটা কেউ জানে না

গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে তিন মাসে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টি বজ্রপাত আঘাত হানে। মূলত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে বেশি বজ্রপাত ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তারা জানিয়েছেন, ভারতের খাসিয়া পাহাড় ও মেঘালয়ে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত মেঘ জমতে থাকে। জমাকৃত মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে অত্র এলাকায়, অর্থাত্ সুনামগঞ্জে বজ্রপাত বেশি ঘটছে। তাতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সর্বসাধারণ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। আকাশে সামান্য মেঘ দেখলেই কৃষক অথবা খেটে খাওয়া মানুষ ঘরমুখী হতে চেষ্টা করেন। আর যারা দূর হাওর-বাঁওড়ে কাজকর্মে নিয়োজিত থাকেন, তারা তখন ভীষণ বিপাকে পড়ে যান। ফলে তারা যখন-তখন দুর্ঘটনার শিকারে পরিণত হন। তেমনি সম্প্রতি (৪ আগস্ট ২০২১) বজ্রপাতে ১৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ ইউনিয়নের পদ্মার পাড়ে। জানা যায়, পদ্মার পাড়ে বরযাত্রী দল ট্রলারে ওঠার অপেক্ষা করছিল, হঠাৎ বৃষ্টি এলে সবাই ঘাটের পাশের টিনের ঘরে আশ্রয় নেয়। অমনি বজ্রপাত ঘটে তাৎক্ষণিক তাদের মৃত্যু হয়; আহত হন অনেকেই। ঘটনার সপ্তাহ তিনেকের মধ্যেই (২৩ আগস্ট ২০২১) দিনাজপুরে পৃথক দুই স্থানে বজ্রপাতে সাত জনের মৃত্যু ঘটে। এভাবে দেশে প্রায় প্রতিনিয়তই আমরা বজ্রপাতে মৃত্যুর সংবাদ জানতে পারছি; যা সত্যিই দুঃখজনক।

বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রাদুর্ভাব

বিষয়টি মাথায় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন অধ্যাপক জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরের পরেই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর্দ্র বাতাস বাংলাদেশের ওপরে ভেসে আসছে। অন্যদিকে উত্তর থেকে হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাস ধেয়ে আসছে। এ দুই ধরনের বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল হওয়ায় বাংলাদেশে ব্যাপক বজ্রপাত ঘটছে।’

অন্য আরেক গবেষক জানান, বাংলাদেশে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে শুরু করে শীতের আগ পর্যন্ত তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রচুর জলীয়বাস্প ঊর্ধ্বমুখী হয়ে মেঘের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আর সেই জলীয়বাস্প ঢুকে যাওয়ার কারণে মেঘের ভেতরে থাকা জলকণা ও বরফকণার সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে বজ্রপাতের সৃষ্টি হচ্ছে।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কী করবেন

তবে যেভাবেই বজ্রপাত হোক না কেন, তাতে জানমালের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হচ্ছে এটিই সত্য কথা। বিশেষ করে বজ্রপাতে পুরুষের মৃত্যুর হার বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। কারণ মাঠ-প্রান্তরে, জলাশয়ে কিংবা রাস্তাঘাটে পুরুষের অবস্থান নারীর তুলনায় বেশি হওয়ায় দুর্যোগের কবলে তারাই বেশি পড়ছেন। ফলে সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে অকালে হারাতে হচ্ছে, তাতে পরিবারটিকে ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে।

এক সমীক্ষায় জানা যায়, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশে, যে সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তার মধ্যে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর অঞ্চলে বেশি বজ্রপাত ঘটেছে। আবার কয়েক বছরের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে বেশি বজ্রপাত ঘটছে। ২০১২ সালে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় বজ্রপাতে একসঙ্গে ১৩ জনের মৃত্যুর খবরও আমরা জানতে পেরেছি। সেই বজ্রপাতটি ঘটেছে তা-ও কিনা আগস্ট মাসে। তাতে প্রতীয়মান হয় বজ্রপাত এখন আর মৌসুম ভিত্তিতে হচ্ছে না। বছরের যে কোনো সময় আঘাত হেনে প্রাণহানি ঘটাচ্ছে।

উষ্ণতায় বেড়েছে বজ্রপাত এক দিনেই নিহত ১২

অতিরিক্ত বজ্রপাত ঘটার জন্য জলবায়ুর পরিবর্তনকেও দায়ী করা হচ্ছে। যে হারে বৃক্ষনিধন ও কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বাড়ছে, তাতে বায়ুমণ্ডলে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফলে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। এই বৈরী আবহাওয়াকে এখন বজ্রপাতের অনুকূলে নয়, মানুষের অনুকূলে আনতে হবে বনায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে। বড় বড় গাছগাছালি লাগিয়ে বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে, তাতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কারণ বজ্রপাত ঘটার সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে মাঠ-প্রান্তরসহ রাস্তার দুই ধারে তালগাছ লাগাতে হবে বেশি বেশি। কারণ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, তালগাছ হচ্ছে প্রকৃতির বজ্রনিরোধক। তাই কাজটি করতে হবে আমাদের এখনই। কারণ একটি তালের চারা রোপাণের ১৪-১৫ বছর পর সেটি বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হয়। শুধু তালগাছ রোপণই নয়, পাশাপাশি বজ্রনিরোধক লাইটপোস্টে সিমেন্ট ব্যবহার করে টানিয়ে দিতে হবে। যেটি নেপালে করা হয়েছে। আমাদের দেশেও বিজিবি ক্যাম্পে ব্যবহূত হচ্ছে। এগুলোকে বলা হয় ‘লাইট মিনার স্টার’, যা ব্যবহার করা যেতে পারে মাঠ-প্রান্তরেও। এটির ব্যবহার খুব সহজ, অর্থকড়িও তেমন খরচ হয় না।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, ব্রিটিশ শাসনামলে একধরনের চৌম্বকীয় পিলার পুঁতে রাখা হয়েছিল দেশের মাঠ-প্রান্তরে কিংবা রাস্তার পাশে। সেগুলোর গায়ে খোদাই করে লেখা ছিল ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বেশি পুঁতে রাখার কারণে অনেকের কাছে এগুলো ‘সীমান্ত পিলার’ নামে পরিচিত। বোতল আকৃতির ওজনদার সেই পিলার বজ্রনিরোধকের কাজে ব্যবহূত হতো; কয়েক বর্গকিলোমিটার সুরক্ষাও দিত।

সাপাহারে ২ ভাইয়ের ওপর বজ্রপাত, একজনের মৃত্যু

জানা গেছে, পিলারের আশপাশে বজ্রপাত ঘটলেও মানুষের তেমন ক্ষতি হতো না। অথচ অসাধুরা লোভের বশবর্তী হয়ে সেই পিলারগুলো তুলে সীমান্তবর্তী দেশে পাচার করে দিচ্ছে। তাতে চৌম্বকীয় পিলার এখন খুব একটা কোথাও দেখা যায় না। দেখা গেলেও সেটাকে পাহারা দিয়ে রাখতে হচ্ছে। কারণ পিলার চুরি বা পাচার করার জন্য দেশে বিশাল এক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আর চুরি যাওয়া সেই চৌম্বকীয় পিলারের খেসারতও দিতে হচ্ছে আমাদের এখন। খবরের কাগজে এ নিয়ে অনেক সংবাদও পরিবেশিত হয়েছে।

শেষ কথা হচ্ছে, চৌম্বকীয় পিলার হারিয়ে আমাদের চুপচাপ বসে থাকলে চলবে না। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে সবাইকে সাহসের সঙ্গে, ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে। দেশের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এর থেকে উত্তরণের জন্য। বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যুব সম্প্রদায় ও শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করতে। সোজা কথা, দেশের আনাচে-কানাচে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। একযোগে লাখ লাখ তালের চারা রোপণ করতে হবে দেশে। তবেই বজ্রপাত থেকে অনেকটাই মুক্তি মিলবে। কাজটি করতে হবে খুব দ্রুত; কারণ একটি তালের চারা বেড়ে উঠতে অনেক সময়ের প্রয়োজন পড়ে। এ ছাড়া অন্যান্য গাছ লাগাতে হবে প্রচুর, সেটি ঝোপজঙ্গল হলেও আপত্তি নেই; বনায়ন সৃষ্টি হলেই হলো। অর্থাত্ বনায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে ছায়াশীতল রাখতে হবে দেশটাকে। আমাদের জানতে হবে এবং জানাতে হবে যে, গাছ শুধু জলবায়ু পরিবর্তন রোধেই ভূমিকা রাখে না, এটি বজ্র প্রতিরোধকও। সুতরাং গাছ লাগিয়ে দেশ বাঁচাই, নিজে বাঁচি অক্সিজেন ফ্যাক্টরি গড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *