জমি ছাড়াই গ্রামীণ ফ্ল্যাটে ঢাকার সমান ব্যয়!

অথচ একটি চলমান প্রকল্পের আওতায় জমি ছাড়াই প্রায় ঢাকা শহরের সমান ব্যয় দেখানো হলো গ্রামীণ বা মফস্বলে ফ্ল্যাট নির্মাণের ক্ষেত্রে।

জমিসহ ঢাকা শহরে মোহাম্মদপুর-মিরপুর এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট ৩ হাজার ৮০০ টাকায় পাওয়া যায়। অথচ জমি ছাড়াই গ্রামীণ অঞ্চলে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা।

বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এরপর প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট নির্মাণ খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতি দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি শেষ মুহূর্তে প্রকল্পে মিলছে না ভারতীয় ঋণ। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

এমন ঘটনা ঘটেছে ‘ইস্টাবলিশমেন্ট অব ৫০০ বেডেড হসপিটাল ও এনসিলারি ভবন ইন যশোর, কক্সবাজার, পাবনা, আব্দুল মালেক উকিল কলেজ এবং জননেতা নুরুল হক আধুনিক হাসপাতাল, নোয়াখালী’ প্রকল্পের ক্ষেত্রে।

সম্প্রতি প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব লোকমান হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় জানানো হয়, পরিকল্পনা কমশিনের পিইসি সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক যত তলা ভিত্তি, তত তলা ভবন নির্মাণ এবং গণপূর্ত বিভাগের ২০১৪ সালের রেট সিডিউলের পরিবর্তে ২০১৮ সালের রেট সিডিউল ধরা হয়। ফলে এখাতে ৪৭৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অনুমোদিত ডিপিপি’র তুলনায় ৩১ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি ।

প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট নির্মাণ খরচ জানতে চেয়েছেন স্বস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব। এরপর পিডাব্লিউডি’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খাইরুল ইসলাম জানান, প্রতি বর্গফুটের নির্মাণ ব্যয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয়েছে।

পরে স্বাস্থ্য সচিব বলেন, ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর এলাকার জমিসহ প্রতিবর্গফুট ফ্ল্যাট ৩ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় কেনা যায়। সেক্ষেত্রে মফস্বল শহরে জমি ছাড়া নির্মাণ খরচ ৩ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি নির্মাণ ব্যয় যুক্তিযুক্তভাবে কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। প্রতি বর্গফুট নির্মাণ ব্যয় গড়ে ৩ হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পটি গত ২২ মে, ২০১৮ সালে একনেক সভায় অনুমোদন হয়। প্রকল্পটির অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৬৬৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং ভারতীয় ঋণ ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।

প্রকল্পটির জুন ২০২১ পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় মাত্র ২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, যা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। প্রকল্পে বাস্তবায়নে ধীর গতি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে আবারও প্রকল্পটি সংশোধন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি থেকে এলওসি বাদ দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৮১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যা সম্পূর্ণ সরকারি খাত থেকে ব্যয় করতে হবে।

অনুমোদিত প্রাক্কলনের ব্যয়ের তুলনায় প্রস্তাবিত প্রথম সংশোধনের প্রাক্কলিত ব্যয়ের পরিমাণ ৬৭৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বা ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। সংশোধনিতে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ জুন ২০২৪ পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ প্রকল্প পরিচালককে খাতভিত্তিক ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা উপস্থাপন করার জন্য অনুরোধ করেন। পরে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান খাতভিত্তিক ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা উপস্থাপন করেন।

স্বাস্থ্য সচিব বলেন, প্রকল্পের কাজের মানের সঙ্গে কোনো কম্প্রমাইজ করা হবে না। সিডিউল অনুযায়ী কাজ করতে হবে, বেশি কাজ করার প্রয়োজন নেই। তবে চুক্তির চেয়ে কম কাজ যাতে না করতে পারে, সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালগুলোতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে জায়গার সাশ্রয় হবে। এতে ভবন নির্মাণেও ব্যয় কমে আসবে এবং হাসপাতাল প্রিমিসিসে অধিক সংখ্যক বৃক্ষরোপণ করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য বৃদ্ধি পাবে।

প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান জানান, অনুমোদিত মূল ডিপিপিতে উল্লিখিত ২১টি বিভাগের সঙ্গে সংশোধিত ডিপিপিতে ১০টি নতুন বিভাগ চাহিদার ভিত্তিতে সংযুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ব্যয় প্রাক্কলন গণপূর্ত বিভাগের ২০১৪ সালের রেট সিডিউল অনুযায়ী করা ছিল। বর্তমানে ২০১৮ সালের রেট সিডিউল প্রযোজ্য হবে। ফলে সব ভবনের নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। যত তলা ভিত্তি তত তলা বিল্ডিং নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া বিভাগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট অন্য খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে সংশোধিত আরডিপিপিতে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণের জন্য এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের চাহিদার ভিত্তিতে ১০টি নতুন বিভাগ ও যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। এতে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার জন্য ঢাকায় আসার প্রবণতা হ্রাস পাবে। ফলে ঢাকার হাসপাতালে রোগীর চাপ কমবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসবাবপত্র ক্রয় খাতে মোট ব্যয় ছিল ৩৫ কোটি ২২ লাখ। অথচ এখন বেড়ে হচ্ছে ১০২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ফলে ১৯১ দশমিক ৫৮ শতাংশ ব্যয় বাড়ছে। ১০টি নতুন বিভাগ সংযোজন করার ফলে আইটেম বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। আসবাবপত্রের ব্যয় প্রাক্কলন গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা বিভাগের দর অনুযায়ী করা হয়েছে। বিলাসবহুল আসবাবপত্র পরিহার করে কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী করে কিনতে বলা হয়েছে।

আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে রোগীর প্রফাইল, চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা জাটাবেইজের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে। এজন্য ডাটাবেইজ ম্যানেজমেন্ট সফটওয়ার প্রস্তুতের জন্য প্রায় ৩৩ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

প্রকল্পে ১৯টি যানবাহন কেনার জন্য ১০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বলেন, গাড়ির সংস্থানের ক্ষেত্রে গাড়ি চালকের জন্য প্রকল্পের জনবল কমিটির সম্মতি ব্যতীত কোনো সংস্থান রাখা যাবে না। তাছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী এবং হাসপাতাল পরিচালকগণের অফিসিয়াল গাড়ি রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রকল্প থেকে অপ্রয়োজনীয় গাড়ির সংস্থান রাখা উচিত হবে না। প্রয়োজনে তাদের অফিসিয়াল গাড়ি প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সংশোধিত প্রকল্পে প্রত্যেকটি হাসপাতালে ওষুধ ও প্রতিষেধক, পথ্য, চিকিৎসা ও শলা চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের সংস্থান রাখা হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ১৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *