ইভ্যালির কাছে বড় কোম্পানিগুলো যত টাকা পাবে

যখন কেউ চোখের সামনে অন্যায় কাজ হতে দেখেন, তখন কী করেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রে, স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে সেটাকে থামানোর চেষ্টা করা হয়।

এ মুহূর্তে ই-কমার্স মহীরুহ ইভ্যালি প্রসঙ্গে সরকারের কাছ থেকে সবাই এই প্রশ্নটির উত্তর প্রত্যাশা করছে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তের বদৌলতে সবাই ইভ্যালির বিতর্কিত ব্যবসায়িক মডেলের ব্যাপারে কম-বেশি জেনে গেছেন।

না, ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করা এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি এমন কোনো জাদুকরী ফর্মুলা আবিষ্কার করেনি, যার কারণে সেটা দেউলিয়া না হয়েও বছরজুড়ে চটকদার বিজ্ঞাপন ও অবিশ্বাস্য মূল্য হ্রাসের অফার দিয়ে যেতে থাকবে।

শুরুর সময় থেকে এ বছরের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি যেভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে, তা কোনো ‘হায় হায়’ কোম্পানির সঙ্গে তুলনীয়। ইংরেজিতে ‘পনজি স্কিম’ নামে পরিচিত এ পন্থায় প্রথমে তারা সরলমনা ভোক্তাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেয়। পরে সেই টাকা দিয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ে পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রচার করে আরও বেশি গ্রাহককে আকৃষ্ট করে। একই পদ্ধতি চক্রাকারে বার বার চালিয়ে তারা প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেয়।

অর্ডারের কয়েক মাস পর, প্রথম দফার গ্রাহকরা তাদের পণ্যের ডেলিভারি পাবেন অথবা তাদের অর্ডার বাতিল হবে। তবে, বাতিল হওয়া অর্ডারের টাকা নগদে পরিশোধ না করে ইভ্যালির অনিবন্ধিত ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে ক্রেডিট আকারে দেওয়া হয়।

এভাবে ইভ্যালি তাদের একটি নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থাও তৈরি করেছে। যে বিষয়ে তাদের কোনো অনুমতি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি নেই।

শুধু তাই নয়, সেই ক্রেডিটের একটি মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও থাকে। পণ্যই যদি সরবরাহ করা না হয়, তাহলে ডিজিটাল ক্রেডিট দিয়ে কী লাভ হবে? অন্যভাবে বললে, ইভ্যালিতে কোনো কিছু কিনতে যাওয়া আর জুয়া খেলা মোটামুটি একই ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।

তারপরেও, ইভ্যালির চাতুর্যপূর্ণ বিপণন কৌশলের সম্মোহনী ক্ষমতা এতটাই তীব্র যে, এ ব্যাপারে মানুষ নিজেদের সংবরণ করতে পারেনি। তবে, এ ক্ষেত্রে ভোক্তারা চরমভাবে হতাশ হয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অসংখ্য অভিযোগ আসে ইভ্যালির বিরুদ্ধে।

যখন অজস্র অভিযোগের সমন্বিত কোরাসের শব্দ আরও বেশি উচ্চকিত হয়ে ওঠে, তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত বছর একটি বহুমুখী তদন্ত শুরু করে। এতে করে ইভ্যালির সব ধামাচাপা দেওয়া অপরাধের বৃত্তান্ত একে একে প্রকাশ হতে থাকে।

এরমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনটি ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। প্রতিবেদন তৈরি করার সময় তারা ইভ্যালির কাছ থেকে তেমন কোনো সহযোগিতাও পায়নি। তবে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি যে সব নথি পেয়েছে, তা থেকে যে কেউ ইভ্যালির আর্থিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালো ধারণা পেতে পারেন।

চলতি বছরের ১৪ মার্চ পর্যন্ত ইভ্যালির কাছে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের প্রায় ৪০৪ কোটি টাকা পাওনা ছিল। অথচ সেসময় প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ইভ্যালির সব সম্পত্তি বিক্রি করলেও মাত্র ১৬ শতাংশ দেনা পরিশোধের সক্ষমতা ছিল তাদের।

ইভ্যালির মোট দেনার মধ্যে আছে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া ২১৩ কোটি নয় লাখ টাকা। পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে অপরিশোধিত মূল্য বাবদ ১৮৯ কোটি নয় লাখ টাকার দেনা।

গত জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন প্রকাশের পর জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর ভবিষ্যৎ পরিচালনা পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার উদ্দেশ্যে নতুন নীতিমালা তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ হয়।

নতুন নীতিমালা অনুসারে, গ্রাহক শুধু পণ্য বুঝে পাওয়ার পরই টাকা পরিশোধ করবে। এই নীতিমালা প্রকৃতপক্ষে আইন মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝামেলায় ফেলেছে।

অপরদিকে, ইভ্যালির কাছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানতে চেয়েছে কীভাবে তারা গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের দেনা পরিশোধ করবে।

এরপর গত ১৯ জুলাই ইভ্যালির কাছে জানতে চায়, চলতি বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে মোট কত টাকা নিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের কত টাকা পরিশোধ করেছে। ইভ্যালিকে পরবর্তী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে এসব তথ্য জানাতে বলা হয়।

তবে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ ধরনের কোনো তথ্য সরবরাহ করতে না পারলেও ধৃষ্টতা দেখিয়ে এর জন্য আরও ছয় মাস সময় চেয়েছে।

এ ধরনের অপরিশোধিত দেনার পরিমাণের তথ্যটি তাদের আর্থিক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা থেকে সহজেই সরবরাহ করতে পারার কথা। এই পরিমাণটি হচ্ছে গ্রাহকদের কাছে দেওয়া ডিজিটাল ক্রেডিট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পাওয়া অগ্রিম অর্থ, পণ্য ও সেবাদাতাদের কাছে পণ্য ও সেবার মূল্য বাবদ প্রদেয় অর্থ এবং কুরিয়ার কোম্পানির মতো অন্যান্য সেবাদাতাদের কাছে প্রদেয় অর্থের সমষ্টি।

ইভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেলের স্বাক্ষর করা চিঠিতে আশ্চর্যজনকভাবে এ তথ্যগুলো সংগ্রহ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়ার জন্য একটি তৃতীয় পক্ষীয় অডিট প্রক্রিয়া চালানোর কথা বলা হয়েছে।

তার মানে কি, ইভ্যালির নিজস্ব কোনো আর্থিক হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়া নেই? যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে সেটিই একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে।

নাকি ইভ্যালি তাদের নিজেদের হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়ার বিশ্বস্ততার ওপর সন্দিহান? এসবই আমাদেরকে একটি প্রতারণার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে এবং আমরা আশা করছি সরকার এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

চিঠিতে একটি মূল্য যাচাইকরণ প্রতিবেদনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের তারল্য বা সচ্ছলতার বিষয়গুলো বোঝার জন্য এ ধরনের প্রক্রিয়া যথেষ্ট নয়।

ইভ্যালির দেনার পরিমাণ বিবেচনায় এটি খুবই ভয়ংকর একটি বিষয়। এ ছাড়াও, খুব সম্ভবত প্রকৃত দেনার পরিমাণটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়েও অনেক বেশি। কারণ, নিরীক্ষণের সময় তারা খুব একটা সহযোগিতা করেনি বললেই চলে।

৩১ জুলাই পাঠানো চিঠিতে ইভ্যালি উল্লেখ করেছে, তারা এক হাজার কোটি টাকা মূল্যমানের একটি বিনিয়োগ চুক্তি করতে যাচ্ছে। যার মধ্যে ২০০ কোটি টাকা শুরুতে আসবে। এ থেকে তারা বোঝাতে চেয়েছে, দেনা মেটানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থের জোগান তাদের হাতের নাগালের মধ্যেই আছে।

কিন্তু তারা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, তাদের ব্যবসার প্রকৃতি, বিনিয়োগের সময়সীমা কিংবা কাঠামো নিয়ে কিছুই উল্লেখ করেনি।

একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইভ্যালি এ ধরনের বিস্তারিত তথ্য দিতে বাধ্য নয়। কিন্তু যেহেতু তারা দেনা মেটানোর জন্য বিনিয়োগের বিষয়টিকে সামনে এনেছে, সেহেতু এ ব্যাপারে সব ধরনের তথ্য দিয়ে তারা তাদের আন্তরিকতা প্রমাণ করত পারতো।

২৭ জুলাই সন্ধ্যায় রাসেলের নিজস্ব ফেসবুক পেজের পোস্ট থেকে জানা যায়, তারা যমুনা গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

পরবর্তীতে যমুনা গ্রুপ প্রকাশ করে যে, তাদের প্রারম্ভিক ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগটি পণ্য ও সেবাদাতাদের আউটস্ট্যান্ডিং ক্রেডিট হিসেবে আসবে। অন্যভাবে বলতে গেলে, যমুনা গ্রুপ দেনাকে সম্পদে রূপান্তর করছে। যার মানে হচ্ছে, তারা আদতে প্রতিষ্ঠানটিতে সরাসরি আর্থিক কোনো বিনিয়োগ করছে না।

দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে একটি লেটার অব ইনটেন্টের মাধ্যমে। যার কোনো আইনি গ্রহণযোগ্যতা নেই। ধরেই নেওয়া যায়, বিনিয়োগের বাকি পরিমাণটিও নগদ টাকার পরিবর্তে যমুনা গ্রুপের পণ্যের মাধ্যমেই আসবে।

তবে, ইভ্যালি কেবল যমুনা গ্রুপের পণ্যই নয়, সব ধরণের ব্র্যান্ডের পণ্যই বিক্রি করে থাকে। এ কারণে রাসেলের ঘোষণাটিকে একটি চটকদার জনসংযোগ বার্তা বলেই মনে হচ্ছে। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বিধাগ্রস্ত পণ্য ও সেবাদাতাদের আশ্বস্ত করা। যাতে তারা ইভ্যালিকে আগের মতোই পণ্য ও সেবা দিতে থাকে। একইসঙ্গে এর আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, সরল মনের ভোক্তাদেরও তাদের প্ল্যাটফর্মে টাকা খরচ করার বিষয়টি অব্যাহত রাখতে প্রভাবিত করা।

১৯ জুলাইয়ের চিঠিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইভ্যালিকে প্রশ্ন করেছে, তারা ভোক্তাদের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ নিয়েছে, সেটা তাদের পণ্য ও সেবাদাতাদের না দিয়ে অন্য কোনো খাতে ব্যয় করেছে?

প্রত্যাশিতভাবেই, ইভ্যালির কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

তবে, এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। এরমধ্যে আছে বিশাল মূল্য ছাড়ের অর্থায়ন, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে নিয়মিত বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে পরিচালিত বিপণন প্রক্রিয়া, বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতা করা- যেমন: ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০২০, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নিউজিল্যান্ড সফর ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের চলচ্চিত্র ‘অপারেশন সুন্দরবন’ এর অর্থায়ন, তাহসান রহমান খানের মতো ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর নিয়োগ দেওয়া, কর্মীদের অতিরিক্ত বেতন দেওয়া, যা এই খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য পদগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং পরিশেষে অনেক বেশি কর্মী নিয়োগ ইত্যাদি।

সুতরাং, যত বেশিদিন ধরে ইভ্যালিকে তাদের নিজস্ব পন্থায় ব্যবসা করতে দেওয়া হবে, ততদিন পর্যন্ত ভোক্তা, পণ্য ও সেবাদাতাদের কাছে তাদের দেনার পরিমাণ বাড়তে থাকবে। একইসঙ্গে এই অশুভ চক্রের সঙ্গে আরও বেশি সরলমনা ভোক্তা জড়িয়ে পড়তে থাকবেন।

পনজি প্রকল্পগুলো শেষ পর্যন্ত তাদের সংগৃহীত সমুদয় অর্থ পাচার করার চেষ্টা করে। ইভ্যালির ক্ষেত্রে এটাই সম্ভবত একমাত্র বিষয়, যেটি এখনো প্রতিহত বা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

এটি করার জন্য ইভ্যালিকে কার্যক্রম পরিচালনা করার অনুমতিও দেওয়ার দরকার নেই বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সোজাসাপ্টা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তাদের ছয় মাস সময় দেওয়ারও দরকার নেই।

সরকারের কি ইভ্যালির পণ্য ও সেবা কিনে ঠকতে যাওয়া সরলমনা, সম্ভাব্য ভোক্তাদের প্রতি সামান্য দায়িত্ববোধটুকুও নেই?

সরকারের কি উচিত হবে সাধারণ জনগণের অর্থ নিয়ে খেলতে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটিকে চলতে দেওয়া? উল্লেখ্য, তাদের চটকদার প্রচারণামূলক কর্মসূচিগুলো এখনো আগের মতোই চলছে।

এর একটি যুক্তিসঙ্গত, কিন্তু খুবই ঝামেলাপূর্ণ ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা হতে পারে আরও বিনিয়োগ নিয়ে আসা। কিন্তু এটা হতে হবে নগদ অর্থের বিনিয়োগ। যার মাধ্যমে সব দেনা পরিশোধ করা হবে এবং একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইভ্যালিকে বাধ্য করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *