যদি অজান্তে বড়লোক হয়ে যেতে পারতাম!

ফেসবুকে, পত্রিকায় মারুফা ইসলামের খবর পড়ছিলাম। চোখের পানি আটকানো দায়। নয় বছর আগে কে বা কারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় তার স্বামীকে।

যে নারী কোনোদিন সেভাবে রাস্তায়ও বের হননি শুরু হয় তার জীবনের যন্ত্রণার অধ্যায়। দুই ছেলেকে নিয়ে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত খুঁজে বেড়িয়েছেন স্বামীকে। পেটের চিন্তাও করতে হয়েছে। ১৭ বছরের ছেলে সংসারের হাল ধরে। মারুফার লড়াই চলতে থাকে।

অবশেষে স্বামীকে তার খোঁজা শেষ হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে গেছে তার জীবন। বাবা গুম। মাও চলে গেছেন। সাইদুলের এখন চিন্তা ছোট ভাই রামিমুল ইসলাম রিফাতকে নিয়ে।

বাবা যখন হারিয়ে যায় রামিমুলের বয়স তখন আড়াই। পত্রিকায় পড়ছিলাম সাইদুলের কথা, ‘রামিমুলকে মা কোল ছাড়া করতে চাইতেন না। বাবার স্মৃতি নেই তার, মায়ের হাতে খেত, ঘুমাতোও মায়ের সঙ্গেই। মৃতদেহে হাত বুলিয়ে দেখেও রামিমুলের বিশ্বাস হয়নি মা আর নেই।’

এইসব লেখা যখন মাথায় ঘুরছে কালের চাকা থেমে নেই। প্রতিদিনই ঘটছে কিছু না কিছু। তেলের দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে অন্যান্য পণ্যের ওপরও।

দেশে কয়েক মাস ধরেই দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ ক্লান্ত। এরইমধ্যে ডিজেলের দাম লিটারে একলাফে বেড়েছে ১৫ টাকা। সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাকশনে নেমে যান গণপরিবহনের মালিকরা।

যথারীতি তারা জিম্মি করে ফেলেন মানুষকে। নিয়ম অনুযায়ী তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন সরকারের প্রতিনিধিরা। বৈঠক শেষে ভাড়া বেড়েছে। ধর্মঘটও প্রত্যাহার হয়েছে। চাপটা এসে পড়েছে শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই। কী আর করা! তাদেরতো কোনো সমিতি নেই।

সম্প্রতি একইদিনে পত্রিকায় দু’টি খবর নজর কেড়েছে। একটি সরকারি। অন্যটি বেসরকারি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। আর বেসরকারি জরিপ অনুযায়ী করোনাকালে দেশে ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ অনেকটাই বদলে গেছে। এটা অস্বীকার করার জো নেই। দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে লাখ লাখ মানুষ। শহর ক্রমশ উপরের দিকে উঠছে। একের পর এক মেগাপ্রজেক্ট নেওয়া হচ্ছে। এটা মুদ্রার একটা দিক। অন্যপিঠে, দুই বেলা আহার যোগাতে নিদারুণ লড়াই করতে হচ্ছে জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে।

এই যখন অবস্থা তখন পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নানের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সহযোগী দৈনিক প্রথম আলো’র রিপোর্ট অনুযায়ী করোনার কারণে দেশের সার্বিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, ‘আমরা কিছুটা পিছিয়েছি, আমাদের লস (ক্ষতি) হয়েছে। কিন্তু আমরা পুষিয়ে নেব। তবে ইতিমধ্যে আমাদের মাথাপিছু আয়ও বড়েছে। আড়াই হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পাচ্ছে, রাত পোহালেই আয় বাড়ছে বাংলাদেশের, আমরা টেরই পাচ্ছি না। আমরা অজান্তেই বড়লোক হয়ে যাচ্ছি।’ সুনামগঞ্জে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন। রোববার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এই সভা হয়। এ সময় তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘তবে বড়লোকের বড়লোকি কিছু রোগও হয়, সেই রোগ থেকে যেন আমরা মুক্ত থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *